দখল ও ভাঙ্গনের শিকার খরস্রোতা চেঙ্গি নদী

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমি গঠিতই হয়েছে পলি মাটি দিয়ে।এরপর এই ভূমির উর্বরাশক্তি ধরে রাখতেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ভূমিকা রেখেছে সেই পলি মাটিই। নদী ভূমি গঠনের এই পলি বহন করে এনেছে,এখনো আনছে। এই ভূমি গঠনের হাজার হাজার বছর পর এখনো সেই নদী মানুষের জীবনে নানা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে প্রধানতম ভূমিকা রেখে চলেছে। আদিকাল থেকেই বাংলাদেশের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি।সেখানেও মূল ভূমিকায় নদী। সাম্প্রতিক সময়ে এই কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি যোগ হয়েছে। ব্যবস্থা হয়েছে আধুনিক সেচের। এজন্য বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এর সবগুলোই নদীকে কেন্দ্র করে।
দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তর্গত বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। শাখা-প্রশাখাসহ প্রায় ২৪,১৪০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে নদী। বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকাই শত শত নদীর মাধ্যমে বয়ে আসা পলি মাটি জমে তৈরি হয়েছে। পাউবো কর্তৃক বাংলাদেশে এখন নদীর সংখ্যা ৪০৫টি। ৪০৫টি নদ-নদীর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশে ছোট বড় সব মিলিয়ে ২৩০ থেকে ২৪০টির মতো নদ- নদী সরকারি হিসেব আছে। এসব নদীগুলোর মধ্যে ৫৭ টি হচ্ছে আন্তঃসীমান্ত নদী যার মধ্যে ৫৪টি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন এবং ৩টি বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে অভিন্ন। দেশে অসখ্য নদ-নদীর মধ্যে চেঙ্গি নদী অন্যতম।
চেঙ্গি নদী বা চিংড়ি নদী বাংলাদেশের পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৯৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৭৭ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক চেঙ্গি নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী নং ০৫।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা পাহাড় ও অরণ্য বেষ্টিত একটি উপজেলা । এই খানে রয়েছে ছড়া ও পাহাড়ী ঝর্ণা । এই উপজেলা বেষ্টিত একটি নদী রয়েছে তার নাম চেঙ্গী নদী। এই চেঙ্গী নদীর দৃশ্য সবাইকে বিমোহিত করে ।এই নদী থেকে উপজাতিগণ বিভিন্ন মাছ ধরে । এই নদীর প্রবাহ বর্তমানে আগের মত নেই । প্রায় স্থানে ভরাট হয়ে গেছে । অতি বৃষ্টি ও বর্ষণে পাহাড়ী ঢলে এই নদীর প্রবাহ বেড়ে যায় । খাগড়াছড়ির মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদীটির নাম চেঙ্গি। চিংড়ি নদী নামেও পরিচিত। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা এই নদী এখন ভাঙনের শিকার।বর্ষা মৌসুমে এই সর্পিল নদীর রূপ বদলে যায়। যেনো ফুঁসে ওঠে নদীটি। শুরু হয় ভাঙন। এবারও নদীর প্রায় ৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে বহু নদীর অস্তিত্ব এখন হুমকির সম্মুখিন। নাব্যতা সঙ্কট এবং খননের অভাবে বহু নদী মুছে গেছে মানচিত্র থেকে। শিল্প বর্জের দূষণ আর অবৈধ দখলের শিকার হয়ে বহু নদী এখন প্রাণহীন। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদনদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা। একদিকে উজানে সীমান্তের ওপারে বাঁধ তৈরি করে এক তরফা পানি সরিয়ে নেয়ার ফলে বাংলাদেশের নদীগুলোতে দেখা দিয়েছে জল সঙ্কট। অন্যদিকে, দেশের মধ্যেই অতিরিক্ত পলি জমে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নানা ধরনের শিল্প বর্জ্যের দূষণে নদীর প্রাণ বৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। পাশাপাশি নদীর পাড় দখল করে, কিংবা নদীর বুকেই চলছে অবৈধ নির্মাণ। ফলে বহু নদী বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হয়তো ইতোমধ্যেই হারিয়ে গিয়েছে, নয়তো কোনো রকমে ধুঁকছে। এমনি দখলের পাশাপাশি ভাঙনের শিকারে উপনীত হয়েছে চেঙ্গি নদী।
ভৌগোলিক দিক দিয়ে নানিয়ারচর উপজেলার ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ‘চেঙ্গী’ নদী। এ নদীর উৎপত্তিস্থল খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাঙ ও পুজগাঙ সঙ্গমস্থল। উত্তরে পার্শ্ববর্তী উপজেলা মহালছড়ি ঘেঁষে এঁকে বেঁকে নানিয়ারচর উপজেলাকে ভেদ করে মিশে গেছে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই কৃত্রিম হ্রদে। নদীর পূর্ব ও পশ্চিমে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম বা এলাকার সকল ছড়া-ছড়ি এসে চেঙ্গী নদীকে বড় করে তুলেছে। যেমন- কেঙ্গালছড়ি,বেতছড়ি,করল্যাছড়ি, গাইন্দ্যাছড়ি, যাদুখাছড়া, সাবেক্ষ্যং,তৈচাকমা,নানাক্রুম, শৈলেশ্বরী, কৃষ্ণমাছড়া, মাউরম্নম (মহাপুরম) ইত্যাদি।
নদীর একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে বর্ষা মৌসুমে পানির উচ্চতা বেড়ে যাবার ফলে এ নদীর গতিপথ সহজে বোঝা যায় না। আগে শুষ্ক মৌসুমে বহমান চেঙ্গী নদী যেদিকে প্রবাহিত হতো প্রাকৃতিক কারণে তা এখন পরিবর্তণ হয়েছে। তৈচাকমামুখ থেকে ডাকবাংলা ও পুরান বাজার হয়ে প্রথমে নদীটির গতিপথ ছিলো-বটবিল ডাকমাঝিছড়া, কুচ্যাবিল,নানাক্রুমমুখ,মংখোলা,কাট্টলতলী,বুড়িঘাট,ভাঙ্গামুড়া ও কমতলী, ত্রিপুরা ছড়ামুখ গোপাল কার্বারী ঘাট হয়ে ৬০ দশকের কাপ্তাই কৃত্রিম হ্রদ। যা প্রাকৃতিক কারণে আগের গতিপথে পলি জমে উঠায় এখন অনেক গ্রাম দূরে ঠেলে দিয়ে নতুন গ্রামকে আপন করে বয়ে চলেছে পুরান বাজার থেকে ১০০০ গজের মধ্যে গোবিন্দ বিল হয়ে মাইচছড়ি বিল ও নতুন বড়াদম এবং সাপমারার কুল ঘেষে।
সরকার অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করার পরও খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে প্রকাশ্যে চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। পরিবেশগত প্রভাব নিরুপণ ছাড়াই বালু উত্তোলন করায় ভাঙছে নদীর পাড়। উপজেলার কোথায়ও বৈধ ইজারাকৃত বালুমহাল না থাকার পরও একাধিক জায়গায় দেদার বালু তুলছে বালুখেকোরা। বালুখেকোরা প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয়রা মুখ খুলতে পারছে না। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান না থাকায় বালুখেকোদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে।
দেখা যায়,‘মহালছড়ি উপজেলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের বিপরীতে চেঙ্গী নদী থেকে দিনরাত বালু তুলছে একটি সিন্ডিকেট। নদী থেকে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে মেশিন। মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে রীতিমতো বালুর ‘পাহাড়’ গড়ে তুলেছে চক্রটি। দিনে কয়েকঘণ্টা মেশিন চালিয়ে বালু তোলা হয়। বালু উত্তোলন করায় হুমকির মুখে চেঙ্গি নদী। খাগড়াছড়িতে টানা বর্ষণের পর চেঙ্গী, মাঈনী ও ফেনী নদীর পানি কমতে থাকায় বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে বিভিন্ন অফিস, স্কুল, মাদরাসা, বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে হচ্ছে।
নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি স্থানীয় ও পুনঃসঙ্ঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নদী যত পরিণত পর্যায়ে এগোতে থাকে (যেমন তিন প্রমত্ত নদী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার ক্ষেত্রে ঘটেছে) ততোই সেগুলি মন্থর ও বিসর্পিল অথবা বিনুনি আকৃতির হতে থাকে, নদীর এ দোলন নদী তীরের ব্যাপক ভাঙন সংঘটিত করে। প্রতি বছর নদীভাঙনের কারণে লক্ষ লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষেতের ফসল, ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট প্লাবনভূমির প্রায় ৫% প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের শিকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ৪৮৯টি থানার মধ্যে প্রায় ৯৪টি থানায় নদীভাঙন ঘটছে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এর সঙ্গে আরও ৫৬টি থানার সন্ধান পেয়েছেন যেখানে নদীভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে প্রায় ১০০টি থানায় নদীভাঙন ও বন্যার দুর্ভোগ প্রায় নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি থানা সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।
নদীর অস্থির প্রকৃতির কারণে বাংলাদেশে ভাঙন এত ব্যাপক ও দ্রুত হারে সংঘটিত হয়। নদীগুলি তাদের গতিপথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চর দ্বারা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি চ্যানেলের সৃষ্ট বিনুনি আকার ধারণ করে। বর্ষাকালে ব্যাপকভাবে তীর উপচানো, তীর ভাঙন ও তটরেখার পরিবর্তন একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বড় বড় নদীর চ্যানেলগুলির ক্রমস্থানান্তর বা পরিবর্তন বছরে ৬০ মিটার থেকে ১৬০০ মিটারের মধ্যে হতে পারে। কোনো বিশেষ বছরে প্রায় ২৪০০ কিমি তটরেখা জুড়ে ব্যাপক ভাঙন ঘটতে পারে। ভাঙনের তীব্রতায় নদী থেকে নদীতে দারুণ ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। কারণ এ ভাঙন নির্ভর করে কি পদার্থ দিয়ে নদীতীর গঠিত, পানির পৃষ্ঠদেশের ভিন্নতা, তীরবর্তী প্রবাহের তীব্রতা, নদীর পরিলেখ রূপ এবং নদীতে পানি ও অবক্ষেপের সরবরাহ ইত্যাদির ওপর। উদাহরণস্বরূপ, পলি ও মিহি বালুতে গঠিত আলগা বাঁধাই, সাম্প্রতিক মজুতকৃত তীরের পদার্থসমূহ ভাঙনের পক্ষে খুবই সংবেদনশীল। বন্যার পানির দ্রুত অপসারণ এ ধরনের পদার্থে তীর ভাঙনের হার ত্বরান্বিত করে। দেশ,সুজলা-সুফলা,শস্য-শ্যামলা এই বাংলা মায়ের শিতল বক্ষ চিরে বয়ে চলেছে অসংখ্য নদ ও নদীর অববাহিকা।এ দেশের অর্থনীতিও নদীনির্ভর। নদী প্রকৃতির দান। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নদী-নালার ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবী জুড়ে কৃষি সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিলো নদীকে ঘিরে। এ অর্থে কৃষি সভ্যতার সমার্থ শব্দ হতে পারে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা। নদীর কল্যাণেই প্রাচীন যুগে বিস্তৃতি শস্যভূমিসহ গড়ে ওঠেছিলো সমৃদ্ধ-স্বশাসিত অসংখ্য গ্রাম।জীবন জীবিকার মুখ্য ভূমিকা পালন করে নদ-নদী। যে সভ্যতা বিকাশে সহায়ক ও কমবেশি নিয়ন্ত্রক ছিলো সিন্ধুসহ একাধিক নদ-নদী। মানব সভ্যতার ক্রম-বিকালে নদ-নদীর ভূমিকা অপরিসীম। আবহমানকাল ধরে রূপসী বাংলার সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে বেশ কিছু প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী এবং সেগুলোর ইতহাস। কালের আবর্তনে দখল ও ভাঙনের কবলে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে একসময়ের খরস্রোতা চেঙ্গি নদী। দেশের অন্যান্য জেলার মতো খাগড়াছড়ি জেলার চেঙ্গি নদী উদ্ধার ও নাব্য হারিয়েছে যেসব নদী দখল-দূষণ রয়েছে সেসকল নদ-নদীকে বাঁচাতে সরকারের পাশাপাশি আমাদের সকলের এগিয়ে আসতে হবে। এখন বড় প্রকল্পগুলো হাতে নেয়ায় নদীর নাব্যতা ফিরে পাবে এটা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক। অর্থাৎ দেশের মধ্যে প্রবহমান অন্যান্য নদীর মতো দখল ও ভাঙনের কবল থেকে চেঙ্গি নদীকে বাঁচানোই এখন সময়ের দাবি।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান),সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক, গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট