ইসরাঈলীয় একজন সৎকর্মশীল নবী হযরত আল-ইয়াসা (আ.)

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
তাওহীদুল ইবাদাতের অর্থ সকল প্রকার ইবাদাত-যেমন প্রার্থনা,সাজদা,জবাই,উৎসর্গ,মানত,তাওয়াক্কুল ইত্যাদি-একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য বলে বিশ্বাস করা।পবিত্র কোরআন ও হাদিস থেকে আমরা দেখি যে,হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূল তাঁদের উম্মাতকে মূলত ‘‘তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ’’বা ইবাদতের একত্বের দাওয়াত দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেক জাতির নিকট নবীদেরকে প্রেরণ করেছেন। ইসলাম ধর্ম মতে,একমাত্র মুহাম্মদই সমগ্র মানবজাতির নিকট আল্লাহর বার্তা পৌছানোর জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন এবং অপর সকল নবীগণ নির্দিষ্ট এক বা একাধিক গোত্র বা জাতির জন্যে প্রেরিত হয়েছিলেন। ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মের বিপরীতে,ইসলামে নবি ও রাসূলের বর্ণনা দেওয়া হয় এভাবে যে,উভয়ই ঐশী প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত এবং রাসূলগণ (বার্তবাহক) গ্রন্থ আকারে একটি সম্প্রদায়ের জন্য ঐশী বার্তা প্রদান করেন কিন্তু রাসূল নন এমন নবীগণ কোনো গ্রন্থ বহন করেন না।অবশ্য ইসলামী বিশ্বাসমতে,নবিগণ আল্লাহ কর্তৃক পরকালে জান্নাত বা স্বর্গ লাভের নিশ্চয়তা প্রাপ্ত ব্যক্তি। আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে সত্য দ্বীনসহ অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। যাদের প্রেরণের মূল লক্ষ্যই ছিলো এ জমিনে তাঁর ইবাদাত তথা দাসত্ব মানুষ শিখানো। মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় জুলুম অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে সঠিক জীবন দর্শন দেখানো।তাই প্রত্যেক নবী-রাসূলই আল্লাহ তা’য়ালা এ মিশন বাস্তবায়নে নিজেদের এবং উম্মতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ কামণায় দোয়া করেছেন।আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবীর বুকে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছে। কোরানে বর্ণিত ২৫ জন নবী-রাসূলের একজন হলো হযরত আল-ইয়াসা (আ.)অন্যতম।

হযরত আল-ইয়াসা (আ.) একজন নবী। পবিত্র কোরআন মাজিদে দুই জায়গায় তাঁর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহ দ্বারা জানা যায় হযরত আল-ইয়াসা (আ.) ছিলেন বনী ইসরাঈলের একজন নবী। পবিত্র কোরআনে এই নবী সম্পর্কে সূরা আন‘আম ৮৬ ও সূরা ছোয়াদ ৪৮ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে অন্য নবীগণের নামের সাথে। সূরা আন‘আম ৮৩ হতে ৮৬ আয়াত পর্যন্ত ইলিয়াস ও আল-ইয়াসা‘সহ ১৭ জন নবীর নামের শেষদিকে বলা হয়েছে-‘ইসমাঈল,আল-ইয়াসা‘,ইউনুস, লুত তাদের প্রত্যেককেই আমরা বিশ্বের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি’ (আন‘আম ৬/৮৬)।অন্যত্র আল্লাহ বলেন,‘আর তুমি বর্ণনা কর ইসমাঈল,হযরত আল-ইয়াসা‘ও যুল-কিফলের কথা।তারা সকলেই ছিলো শ্রেষ্ঠগণের অন্তর্ভুক্ত’ (ছোয়াদ ৩৮/৪৮)। উক্ত বর্ণনায় বুঝা যায় যে,আল-ইয়াসা‘ (আ.) নিঃসন্দেহে একজন উঁচু স্তরের নবী ছিলেন।

হযরত আল-ইয়াসা (আ.) ইফরাঈম বিন ইউসুফ বিন ইয়াকুব-এর বংশধর ছিলেন। তিনি ইলিয়াস (আ.)-এর চাচাতো ভাই এবং তাঁর নায়েব বা প্রতিনিধি ছিলেন। হযরত ইলিয়াস (আ.) সোলায়মান (আ.) পরবর্তী পথভ্রষ্ট বনু ইস্রাঈলগণের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁর পরে আল-ইয়াসা‘ নবী হন এবং তিনি ইলিয়াস (আ.)-এর শরীয়ত অনুযায়ী ফিলিস্তিন অঞ্চলে জনগণকে পরিচালিত করেন ও তাওহীদের দাওয়াত অব্যাহত রাখেন। বাইবেলে তাঁর বিস্তারিত অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। সেখানে তাঁর নাম ‘ইলিশা ইবনে সাকিত’ বলে উল্লেখিত হয়েছে।
ইসলামী ঐতিহ্য মতে আল্লাহ প্রত্যেক জাতির নিকট নবিদেরকে প্রেরণ করেছেন। ইসলাম ধর্ম মতে একমাত্র হযরত মুহাম্মদই সমগ্র মানবজাতির নিকট আল্লাহর বার্তা পৌছানোর জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন এবং অপর সকল নবিগণ নির্দিষ্ট এক বা একাধিক গোত্র বা জাতির জন্যে প্রেরিত হয়েছিলেন। যদিও অনেক নবির জীবনের ঘটনা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু পাঁচজন প্রধান নবীর প্রথম চারজনের জীবনায়নের বিশেষ বর্ণনা ও অলঙ্কারপূর্ণ গুরুত্বের প্রতি তা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। মুহাম্মদের পূর্বের সকল ব্যক্তিত্বের মধ্যে,হযরত মুসা সবচেয়ে বেশি বার কোরআনে উল্লেখিত হয়েছেন।পঞ্চমজন অর্থাৎ মুহাম্মদের ক্ষেত্রে,পবিত্র কোরআন তাঁকে সরাসরি সম্বোধন করেছে। আল্লাহ তা’য়ালা সর্বযুগে সব জাতির কাছে নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন।আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন,‘প্রতিটি জাতির জন্য পথ-প্রদর্শনকারী রয়েছে।’(সুরা : আর রাদ, আয়াত : ১৩) অন্যত্র এরশাদ করেছেন,‘আমি রাসূল প্রেরণ না করে কাউকে শাস্তি দিই না।’(সূরা :বনি ইসরাইল,আয়াত : ১৬৫)

প্রত্যেক নবী-রাসূলগণ ছিলো সৎ ও ধৈর্যশীল। সব নবী-রাসুলের কোনো না কোনো পেশা ছিলো। তাঁরা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতেন না। বরং স্বীয় হস্তে অর্জিত জিনিস ভক্ষণ করাকে পছন্দ করতেন।মহানবী (সা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো কোন ধরনের উপার্জন উত্তম ও শ্রেষ্ঠ? তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন,ব্যক্তির নিজ হাতে কাজ করা এবং সৎ ব্যবসা। (সুয়ুতি আদদুররুল মানসুর,খন্ড ৬,পৃষ্ঠা ২২০) হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হালাল রুজি অর্জন করা ফরজের পর একটি ফরজ।’(সহিহ বুখারি ও মুসলিম) ঈসা (আ.) এক ব্যক্তিকে অসময়ে ইবাদাতখানায় দেখে প্রশ্ন করলেন,তুমি এখানে বসে ইবাদত করছ,তোমার রিজিকের ব্যবস্থা কে করে? লোকটি বলল,আমার ভাই আমার রিজিকের ব্যবস্থা করে। ঈসা (আ.) তাকে বলেন, সে তোমার চেয়ে অনেক উত্তম। (হেদায়াতুল মুরশিদিন)।কবির ভাষায়,‘নবীর শিক্ষা কোরো না ভিক্ষা,মেহনত করো সবে।’ নবী-রাসুলরা হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব।তাঁরা স্বহস্তে অর্জিত সম্পদে জীবিকা নির্বাহ করতেন। হযরত আদম (আ.) ছিলেন একজন কৃষক। তিনি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।তাঁর ছেলেদের পেশাও ছিলো চাষাবাদ। তা ছাড়া তিনি তাঁতের কাজও করতেন। কারো কারো মতে, তাঁর পুত্র হাবিল পশু পালন করতেন। কৃষিকাজের যন্ত্রপাতির নাম আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন—আল্লাহর বাণী, ‘আর আল্লাহ আদমকে সব নামের জ্ঞান দান করেছেন।’(সুরা :বাকারা, আয়াত : ৩১) শিস (আ.)ও কৃষক ছিলেন। তাঁর পৌত্র মাহলাইল সর্বপ্রথম গাছ কেটে জ্বালানি কাজে ব্যবহার করেন। তিনি শহর,নগর ও বড় বড় কিল্লা তৈরি করেছেন। তিনি বাবেল শহর প্রতিষ্ঠা করেছেন। (ইবনে কাসির) ইদ্রিস (আ.)-এর পেশা ছিলো কাপড় সেলাই করা। কাপড় সেলাই করে যে অর্থ উপার্জন করতেন, তা দিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। ইদ্রিস শব্দটি দিরাসা শব্দ থেকে নির্গত। তিনি বেশি পরিমাণে সহিফা পাঠ করতেন বলে তাঁকে ইদ্রিস বলা হয়। পড়াশোনার প্রথা তাঁর সময় থেকে চালু হয়। একদল পন্ডিত মনে করেন,হিকমত ও জ্যোতির্বিদ্যার জন্ম ইদ্রিস (আ.)-এর সময়ই হয়েছিলো। হযরত নুহ (আ.) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে নৌকা তৈরির কলাকৌশল শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং আল্লাহর নির্দেশে তিনি নৌকা তৈরি করেছিলেন। আল্লাহর বাণী—‘আর তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার ওহী অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ করো। ’(সূরা : হুদ, আয়াত : ৩৭) তিনি ৩০০ হাত দীর্ঘ, ৫০ হাত প্রস্থ,৩০ হাত উচ্চতাসম্পন্ন একটি বিশাল নৌকা তৈরি করেন।হযরত হুদ (আ.)-এর জীবনী পাঠান্তে জানা যায় যে তাঁর পেশা ছিল ব্যবসা ও পশু পালন। ব্যবসা ও পশু পালন করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। হযরত সালেহ (আ.)-এর পেশাও ছিলো ব্যবসা ও পশু পালন। হযরত লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের লোকেরা চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত ছিলো। এতে প্রতীয়মান হয় যে তিনিও জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতেন চাষাবাদের মাধ্যমে। হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবনী পাঠান্তে জানা যায় যে তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য কখনো ব্যবসা, আবার কখনো পশু পালন করতেন। হযরত ইসমাইল (আ.) পশু শিকার করতেন। তিনি ও তাঁর পিতা উভয়ই ছিলেন রাজমিস্ত্রি। পিতা-পুত্র মিলে আল্লাহর ঘর তৈরি করেছিলেন। হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর পেশা ছিলো ব্যবসা,কৃষিকাজ করা ও পশু পালন। হযরত ইউসুফ (আ.) রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বেতন হিসেবে রাষ্ট্রীয় অর্থ গ্রহণ করতেন। এরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছেন।’(সূরা :ইউসুফ,আয়াত : ১০১) শোয়াইব (আ.)-এর পেশা ছিলো পশু পালন ও দুধ বিক্রি।পশু পালন ও দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর কন্যারা চারণভূমিতে পশু চরাতেন। হযরত দাউদ (আ.) ছিলেন রাজা ও নবী। সহিহ বুখারির ব্যবসা অধ্যায়ে রয়েছে যে দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন। তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন, হে আল্লাহ! এমন একটি উপায় আমার জন্য বের করে দিন,যেনো আমি নিজ হাতে উপার্জন করতে পারি। অতঃপর তাঁর দোয়া কবুল হয় এবং আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে লোহা দ্বারা বর্ম ও অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করার কৌশল শিক্ষা দেন। শক্ত ও কঠিন লোহা স্পর্শ করলে তা নরম হয়ে যেত। যুদ্ধাস্ত্র, লৌহ বর্ম ও দেহবস্ত্র প্রস্তত করা ছিল তাঁর পেশা। এগুলো বিক্রি করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। হযরত সোলায়মান (আ.) ছিলেন সমগ্র পৃথিবীর শাসক ও নবী। তিনি তাঁর পিতা থেকে অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। তিনি নিজেও অঢেল সম্পদের মালিক ছিলেন। ভিন্ন পেশা গ্রহণ করার চেয়ে নিজ সম্পদ রক্ষা ও তদারকি করাই ছিল তাঁর প্রদান দায়িত্ব। মানব-দানব,পশু-পাখি,বাতাস ইত্যাদির ওপর তাঁর কর্তৃত্ব ছিলো। তাঁর সাথি ঈসা ইবনে বরখিয়া চোখের পলক ফেলার আগে বিলকিসের সিংহাসন সোলায়মান (আ.)-এর সামনে এনে হাজির করেন। হযরত মুসা (আ.) ছিলেন একজন রাখাল। তিনি শ্বশুরালয়ে মাদায়েনে পশু চরাতেন। সিনাই পর্বতের পাদদেশে বিরাট চারণভূমি মাদায়েনের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। লোকজন সেখানে পশু চরাত। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত মুসা (আ.)।আট বছর তিনি স্বীয় শ্বশুর শোয়াইব (আ.)-এর পশু চরিয়েছেন। হযরত হারুন (আ.)-এর পেশাও ছিলো পশু পালন। পশু পালন করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। হযরত ইলিয়াস (আ.)-এর পেশাও ছিলো ব্যবসা ও পশু পালন। আইউব (আ.)-এর পেশা ছিলো গবাদি পশু পালন।তাঁর প্রথম পরীক্ষাটি ছিলো গবাদি পশুর ওপর।ডাকাতরা তাঁর পশুগুলো লুট করে নিয়ে গিয়েছিলো। (আনওয়ারে আম্বিয়া, ই.ফা.বাংলাদেশ) ইউনুস (আ.)-এর গোত্রের পেশা ছিলো চাষাবাদ। সুতরাং কারো কারো মতে,তাঁর পেশাও ছিলো চাষাবাদ। যাকারিয়া (আ.) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে মহানবী (সা.) বলেছেন,যাকারিয়া (আ.) কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন।তাই তাঁর শত্রুরা তাঁর করাত দিয়েই তাঁকে দ্বিখন্ডিত করে।(সহিহ বুখারি) ইয়াহইয়া (আ.) প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে তিনি জীবনের একটি সময় জঙ্গলে ও জনহীন স্থানে কাটিয়েছিলেন। আহার হিসেবে তিনি বৃক্ষের লতাপাতা ভক্ষণ করতেন।(আনওয়ারে আম্বিয়া) যুলকিফল (আ.)-এর পেশা ছিলো পশু পালন। অন্যান্য নবী-রাসূলদের মতো হযরত আল-ইয়াসা (আ.)-এর পেশা ছিলো ব্যবসা ও পশু পালন। হযরত ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.)-এর আবাসস্থল প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন,‘আমি তাদের উভয়কে এক উচ্চ ভূমি প্রদান করেছিলাম,যা সুজলা ও বাসযোগ্য ছিলো।’(সূরা :আল মু’মিনুন, আয়াত : ৫০) এই উচ্চ ভূমি হলো ফিলিস্তিন। তিনি ফিলিস্তিনে উৎপন্ন ফলমূল খেয়ে বড় হয়েছেন। তিনি ঘুরে ঘুরে অলিতে-গলিতে দ্বীনের দাওয়াতি কাজ করতেন। যেখানে রাত হতো, সেখানে খেয়ে না খেয়ে নিদ্রা যেতেন। তাঁর নির্দিষ্ট কোনো পেশা ছিলো না। মহানবী (সা.) ছিলেন একজন সফল ও সৎ ব্যবসায়ী।তিনি এরশাদ করেছেন,‘সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ীদের হাশর হবে নবী,সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে।’(আদ্দুররুল মানসুর,ষষ্ঠ খন্ড,পৃষ্ঠা ২২০) তিনি গৃহের কাজ নিজ হাতে করতেন। বকরির দুধ দোহন করতেন। নিজের জুতা ও কাপড় সেলাই ও ধোলাই করতেন,গৃহ ঝাড়ু দিতেন। মসজিদে নববী নির্মাণকালে শ্রমিকের মতো কাজ করেছেন।খন্দকের যুদ্ধে মাটি কেটেছেন। বাজার থেকে প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় করতেন।তিনি এরশাদ করেন,‘বর্শার ছায়ার নিচে আমার রিজিক নির্ধারণ করা হয়েছে তথা গণিমতের মাল হলো আমার রিজিক।’ (কুরতুবি, ১৩ তম খন্ড,পৃষ্ঠা ১২)
আল্লাহ মানুষের কাছে তাঁর হুকুম-আহকাম হেদায়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য যাদের মনোনীত করেন তাঁরা নবী বা রসুল হিসেবে অভিহিত। মানুষের মধ্য থেকেই নবী-রাসূলকে মনোনীত করা হয়।শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহ তাঁর হুকুম আহকাম ও হেদায়াত বান্দাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য যে ব্যবস্থা বা পদ্ধতি অবলম্বন করেন তাকে রিসালাত বলা হয়।পৃথিবীতে অসংখ্য নবী-রাসূল আগমন করেছেন। যাদের সংখ্যা এক লাখ ২৪ হাজার মতান্তরে দুই লাখ ২৪ হাজার। পবিত্র কোরআনে ২৫ জন নবী-রসুলের নাম উল্লেখ আছে। রিসালাত আল্লাহর বিরাট দান। যাকে ইচ্ছা তিনি তাঁকে তা দান করেন।বলে বা চেয়ে দাবি করে এ মর্যাদার অধিকারী হওয়া যায় না। প্রত্যেক নবীর দাওয়াত ছিলো একই। আল্লাহর দীনকে প্রতিষ্ঠিত করা।তাঁদের কোনো একজনকে অস্বীকার করলে সবাইকে অস্বীকার করা বোঝায়।নবী রসুলদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এরশাদ করা হয়েছে,‘প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি,যিনি এই বলে তাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন, আল্লাহর বন্দেগী কর এবং তাগুতের আনুগত্য পরিহার কর।এরপর তাদের মধ্য থেকে কাউকে আল্লাহ হেদায়াত দান করলেন আর কারও ওপর গোমরাহী চেপে বসলো। সুতরাং তোমরা জমিনে পরিভ্রমণ কর আর দেখ মিথ্যাবাদীদের পরিণাম কী হয়েছিলো। (১৬-সূরা নাহল : ৩৬)।

এ পৃথিবীর ইতিহাসে বহু সাধু,গুরু,সন্যাসী ও গোত্রপ্রধানেরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষের ভক্তি-বিশ্বাসকে বলি দিয়েছে। যুগে যুগে বিবেক-বুদ্ধির পূজারী সমাজের কর্তাব্যক্তিরা মানুষের সরলতার সুযোগে কত যে মতবাদ আবিষ্কার করেছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কেউ মানুষকে বলেছে, ভোগবাদেই শান্তি। কেউ বলেছে, বৈরাগ্যেই মুক্তি। কেউ পূর্বপুরুষদের সমাধি,প্রতিমা, ভাষ্কর্য আর কেউ আকাশের চন্দ্র, সূর্য,নক্ষত্রকে খোদা সাব্যস্ত করেছে। কেউ তো নিজেই খোদা দাবি করেছে। কেউ বলেছে খোদা তিনজন। আর কারো হিসাব মতে খোদার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তেত্রিশ কোটি। কেউ প্রচার করেছে,খোদা বা পরকাল বলে কিছু নেই।এ দুনিয়াই সব। আসল হচ্ছে বুদ্ধির মুক্তি, আত্মার বিকাশ আর মানবকল্যাণ।কেউ মানুষের সীমাবদ্ধ বিবেককে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত বলে খোদার আসনে বসিয়ে দিয়েছে। আর কেউ বিবেকের দরজা-জানালা সব বন্ধ করে নিজেদের মনগড়া কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।

ইতিহাসের পরিক্রমায় দেখা যায়,স্বার্থান্বেষী লোকেরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পূর্বের আসমানী কিতাবে বারংবার হস্তক্ষেপ চালিয়েছে। ক্ষমতাসীনেরাও দফায় দফায় বৈঠক করে সেসব কিতাবে একাধিক সংশোধনী এনেছে। কেউ তো ঐক্য-সম্প্রীতির দোহাই দিয়ে এক খোদা ও বহু খোদার ধর্মের মিশেলে সম্পূর্ণ নতুন মত প্রবর্তন করতেও ছাড়েনি।আর একদল হতভাগ্য মানুষ সবকিছুতেই বিশ্বাস স্থাপন করেছে। শিশু যেমন কাগজের টুকরো নিয়ে বিচিত্র খেলা করে। কখনো দুমড়ে মুচড়ে ফেলে। কখনো মেলে ধরে। কখনো খোলে আবার বন্ধ করে। আর যখন ইচ্ছে হয় ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে আনন্দ লাভ করে। তেমনি এরাও মানবতার ভক্তি,বিশ্বাস ও আস্থার সঙ্গে যুগ যুগ ধরে এরূপ নির্মম ছিনিমিনি খেলেছে এবং নামে বেনামে আজো খেলে চলেছে।
পৃথিবীর শুরু থেকেই মানুষ এক অভিন্ন দ্বীনের অনুসারী ছিলো। মানুষকে আল্লাহ তা’য়ালা সীরাতুল মুসতাকীমের প্রতি দাওয়াত দেয়ার জন্য প্রথম থেকেই নবী-রাসূল প্রেরণের ধারা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁদেরকে প্রেরণ করার মূল উদ্দেশ্যই ছিলো মানুষকে সকল দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করা।আল্লাহ প্রদত্ত ঐশী শিক্ষার দাওয়াত দেয়া। মানুষের যাবতীয় দ্বন্দ্বের অবসান ঘটানো এবং অসভ্যতার অন্ধকার থেকে তাদেরকে ঈমানের আলোকিত পথে বের করে আনা। আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন-(শুরুতে) সমস্ত মানুষ একই দ্বীনের অনুসারী ছিলো।তারপর (যখন তাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিল,তখন) আল্লাহ নবী পাঠালেন।যারা (সত্যপন্থীদের) সুসংবাদ শোনাত এবং (মিথ্যাশ্রয়ীদের কে) ভীতি প্রদর্শন করতো।আর তাঁদের সঙ্গে সত্যসম্বলিত কিতাব নাযিল করলেন। যাতে তাঁরা মানুষের মধ্যকার মতভেদপূর্ণ বিষয়ে মীমাংসা করে দেয়। (সূরা:বাকারা,আয়াত-২ : ২১৩.)

আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতির হেদায়েত এবং পথপ্রদর্শনের লক্ষ্যে সর্বযুগে প্রত্যেক জাতির কাছে নবী-রাসুলগণদেরকে প্রেরণ করেছেন।সম্মানিত নবী-রাসূলগণ প্রত্যেকেই ছিলেন কর্মঠ,সৎকর্মশীল এবং নিজ হাতে উপার্জনকারী। যেমনটা ছিলেন হযরত আল-ইয়াসা (আ.)।গোটা মানবজাতির জন্য তারা ছিলেন পথপ্রদর্শক এবং আদর্শ।তারা ছিলেন জগতের একেকজনন শ্রেষ্ঠ মানব।তাদের জীবনাচার কেমন ছিলো,তাদের আদর্শ, অভ্যাস,পেশা ও কাজকর্ম সম্মন্ধে অবগতিলাভ করার ভেতরে মানবজাতির জন্য নিঃসন্দেহে শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট