আল্লাহর সম্ভাষিত একজন পরাক্রমশালী রাসূল হযরত মূসা (আ.)

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
নবী-রাসূলরা আল্লাহর মনোনীত ও প্রেরিত পুরুষ। পৃথিবীর বুকে আল্লাহর একত্ববাদের প্রতিষ্ঠা ও তাঁর দ্বীন প্রচারের জন্য আল্লাহ তাঁদের নির্বাচিত করেছেন। পৃথিবীতে আল্লাহ তা’য়ালা অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের ভেতর ২৫ জনের নাম পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে। নবী রাসূলদের মধ্যে ১৮ জনের নাম সূরা আনআমের ৮৩ থেকে ৮৬ নম্বর আয়াতে একত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং বাকিদের নাম অন্যত্র এসেছে। প্রথম মানুষ আদম (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে নবী আগমনের ধারাক্রম শুরু হয় এবং মহানবী মুহাম্মাদ (সা.) এর মাধ্যমে তা শেষ হয়। ঐতিহাসিকরা কোরআন-হাদিসে বর্ণিত নবী-রাসূলদের আগমনের একটি ধারাক্রম বর্ণনা করেন। এই ধারাক্রম যতোটা না কোরআন-হাদিস নির্ভর তার চেয়ে বেশি ইতিহাস-আশ্রিত।
হযরত মুসা (আ.) বনী ঈসরাইল বংশের একজন পরাক্রমশালী নবী ছিলেন। হযরত মূসা কালিমুল্লা নামে খ্যাত। যেহেতু তিনি তুর পাহাড়ে আল্লাহা তা’য়ালার দর্শন লাভ করে তার সাতে সরাসরি কথা বলার সুযোগ লাভ করেছিলেন। একমাত্র হযরত মুহাম্মাদ (সা.)ব্যতীত এই পরম সৌভাগ্য লাভ করার কোনো নবীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ জন্য তাঁর নাম করণ করা হয়েছে ‘‘কালিমুল্লাহ’’।
হযরত মূসা (আ.)প্রথম সারির একজন নবী। পবিত্র কোরআন শরিফে তিনি বহু আলোচিত ব্যক্তি হিসাবে সুনামের অধিকারি হয়েছেন। তাঁর জীবনে যতগুলা ঘটনা পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে তা নজির বিহীন। হযরত মূসা (আ.) এর পিতার নাম ছিলো ইমরান। মাতার নাম নিয়ে মতবিরোধ আছে। তবে নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা যায় খাতুন নামে একজন বনি ইসরাইল বংশিয়া সম্ভান্ত মহিলা ছিলেন তাঁর মাতা। হযরত মূসা (আ.) এর জন্ম বৃত্তান্ত হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর জন্ম বৃত্তান্তের প্রায় হুবহু মিলে যায়।
শুয়াইব (আ.)-এর কন্যার সঙ্গে মুসা (আ.)-এর শুভ পরিণয়ের ঘটনা খুবই অস্বাভাবিক ও ব্যতিক্রম। পিতা নিজে স্বেচ্ছায় কন্যাদানে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। দুই কন্যা থেকে পছন্দ মতো একটিকে বাছাই করার সুযোগ দিলেন। মূসা (আ.) ছোট কন্যাকে নির্বাচন করলেন। তিনি ছোট মেয়ের মাঝে বিশেষ কিছু গুণ ও উন্নত চরিত্রের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন। হযরত মূসা (আ.)-এর স্ত্রী উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। পবিত্র কোরআনুল কারীম নিজেই সেই ঘটনার সত্যায়ন করেছেন। আল্লাহ বলেন,‘তখন নারীদ্বয়ের একজন তার কাছে সলজ্জ পদে আসলো। সে বললো-‘আমার পিতা তোমাকে ডাকছে। তুমি আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়েছ। তোমাকে তোমার প্রতিদান দেওয়ার জন্য।’ (সূরাঃ কাসাস,আয়াত-২৫)
হযরত মূসা (আ.) এর জন্ম হয়েছিলো তাঁর কওমের উপরে আপতিত রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞের ভয়ংকর বিভীষিকার মধ্যে। আল্লাহ তাঁকে অপূর্ব কৌশলের মাধ্যমে বাঁচিয়ে নেন। অতঃপর তাঁর জানী দুশমনের ঘরেই তাঁকে নিরাপদে ও সসম্মানে লালন-পালন করালেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মা ও পরিবারকে করলেন উচ্চতর সামাজিক মর্যাদায় উন্নীত। অথচ মূসার জন্মকে ঠেকানোর জন্যই ফেরাঊন তার পশুশক্তির মাধ্যমে বনী ঈসরাইলের শত শত শিশু পুত্রকে হত্যা করেছিলো। হযরত মূসা (আ.) এর সময় যে ফেরাউন ছিলো তিনি ১৮তম রাজবংশের,তার নাম কাবুস বলে উল্লেখ করা হয়। সে যুগে ফেরাউন হতো মিসরের সম্রাটের খেতাব। ফেরাউন যখন স্বপ্নে দেখলেন যে,বনী ঈসরাইল বংশে জন্মগ্রহণকারী এক পুত্র সন্তান কর্তৃক তিনি বিতাড়িত হবেন। তার রাজত্বের অবসান ঘটবে এবং তার প্রবর্তিত দ্বীনের পরিবর্তন হবে। তখন তিনি তার পরিষদবর্গকে এ বিষয় অবিহত করলেন এবং এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। হামান ছিলেন ফেরাউনের মন্ত্রী। তাদের স্বপ্নের ব্যাখার ভিত্তিতে ফেরাউন শঙ্কিত হয় এবং তার প্রতিকার হিসেবে তিনি ফরমান জারি করেন যে,বনী-ইসরাঈলের কোনো নবজাতক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলেই যেনো তাকে হত্যা করা হয়। প্রতিটি সন্তান-স¤া¢বা মায়ের প্রতি যেনো নজরদারী রাখা হয়। এভাবে কিছুকাল অতীবাহিত হওয়াতে বনী ঈসরাইলের পুত্র সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে এবং এতে করে ফেরাউনের সম্প্রদায়ের লোকজন আশঙ্কা প্রকাশ করে যে,বনী ঈসরাইল বংশের বিলুপ্ত ঘটলে তাদের দাস ও শ্রমিকের অভাব ঘটবে এবং দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। তারা এ আশঙ্কার বিষয়টি ফেরাউনকে অবহিত করেন। অতঃপর তিনি নির্দেশ দেন যে,বছর অন্তর অন্তর যেনো পুত্র সন্তান হত্যা করা হয়; তবে গোপনে গোপনে সার্বিক হত্যার ঘটনা কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। বর্ণিত আছে যে,বছর হত্যার আদেশ রহিত ছিলো সেই বছর হারুন জন্মগ্রহণ করেন। আর হত্যার আদেশ যখন বলবৎ ও কার্যকরী ছিলো সেই বছর হযরত মূসা মায়ের পেটে আসেন। বিষয়টি তার স্বীয় কন্যা মরিয়ম ব্যতীত আর কেউ জানত না। কথিত আছে ‘কাবেলা’ নামক এক যুবতী স্ত্রী মূসার মাতার প্রতি প্রহরী রূপে নিযুক্ত ছিলো। ভূমিষ্টকালীন সময়ে সে হাজির হয় সদ্যোজাত মূসার রূপ লাবণ্য দর্শনে কাবেলা মুগ্ধ হয়ে পড়ে এবং শিশুর প্রতি তার স্নেহ-মায়া সৃষ্টি হয়। সে মূসার জননীকে অভয় দিয়ে বলে,‘তুমি চিন্তা করিও না, আমি এ বিষয় প্রকাশ করিবো না। এভাবে মূসা জননী শিশু মূসাকে তিন চার মাস পর্যন্ত বুকের দুধা খাইয়ে গোপনে বড় করতে থাকেন। শিশু মূসার জন্মের পর থেকেই উম্মে মূসা বিচলিত হয়ে পড়েন এই ভেবে না জানি এ সংবাদ ফিরআউনের দরবারে পৌঁছে যায়। নিষেধাজ্ঞার কালে গর্ভধারণ,পুত্র সন্তান প্রশব এ সমগ্র বিষয়টি উম্মে মূসাকে সার্বক্ষণিকভাবে চিন্তাক্লিষ্ট ও তটস্থ করে রাখে। ভয় ও শঙ্কায় তার দিন অতীবাহিত হতে থাকে। কিভাবে শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখা যায় এই ভেবে তিনি দুঃশ্চিন্তা গ্রস্তু হয়ে পড়েন। যখন আর মূসার উপস্থিতি গোপন রাখা সম্ভব ছিলো না,তখন তার মা তাঁকে আল্লাহ্র হুকুমে শিশু মূসাকে স্থাপনপূর্বক চাদরে আবৃত করে একটি ঝুড়িতে রেখে নীল নদে ভাসিয়ে দেন। আল্লাহ্ তা’য়ালা সূরা আল কাসাসের ৭ নম্বর আয়াতে বলেন,আমি মূসা-জননীকে আদেশ পাঠালাম যে,তাকে স্তন্য দান করতে থাকো। অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশঙ্কা করো,তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, দুঃখ করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবো এবং তাকে পয়গম্বরগণের একজন করবো।”
আল্লাহ তা’য়ালা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য মোট ১০৪ খানা কিতাব নাজিল করেছেন। এর মধ্যে তাওরাত, জাবুর, ইনজিল ও কোরআন মজিদ শ্রেষ্ঠতম এবং সবচেয়ে বড়। তাওরাত মূসা (আ.)-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। তাওরাত প্রাপ্তির জন্য আল্লাহর নির্দেশে মূসা (আ.) তুর পাহাড়ে অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তিনি ৪০ দিন রোজা রেখেছেন। ইতিকাফ করেছেন। বর্ণিত আছে যে মূসা (আ.) মিসরে অবস্থানকালে বনি ঈসরাইলকে জানিয়েছেন যে আল্লাহ তা’য়ালা তাদের শত্রুকে ধ্বংস করে দেবেন। এবং তাদের কিতাব দান করবেন। ওই কিতাবে আদেশ-নিষেধ, করণীয়-বর্জনীয় সংক্রান্ত বিধি-বিধান থাকবে। অতঃপর যখন ফেরাউন ধ্বংস হয়ে গেলো তখন মূসা (আ.) তাঁর প্রতিপালকের কাছে আসমানি কিতাব প্রার্থনা করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’য়ালা মূসা (আ.)-কে প্রথমে ৩০ দিন ইতিকাফ ও রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সেটি ছিলো জিলকদ মাসে। রোজার কারণে সৃষ্ট মুখের দুর্গন্ধ নিয়ে তিনি তাঁর প্রভুর দরবারে যাওয়া অপছন্দ করেন। তাই তিনি মেসওয়াক করে নেন। তখন ফেরেশতারা বললো,‘আমরা আপনার মুখ থেকে মেশকে আম্বরের সুঘ্রাণ উপভোগ করছিলাম, আর আপনি মেসওয়াক করে তা নষ্ট করে দিলেন!’ তখন আল্লাহ তা’য়ালা অতিরিক্ত আরো ১০ দিন রোজা ও ইতিকাফের নির্দেশ দেন। এই ১০ দিন ছিলো জিলহজের প্রথম ১০ দিন। এ ঘটনা থেকে সুফিরা বলে থাকেন যে,আত্মশুদ্ধি অর্জন ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার সংশোধনের ক্ষেত্রে ৪০ দিনের একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। এক হাদিসে এসেছে,যে ব্যক্তি ৪০ দিন নিরলসভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, আল্লাহ তা’য়ালা তার অন্তর থেকে জ্ঞান ও হিকমতের ঝরণাধারা প্রবাহিত করে দেবেন। এ ছাড়া ৪০ দিন প্রথম তাকবিরের সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করলে কপটতা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা হাদিসে এসেছে।
প্রাচীনকাল থেকেই মিসর সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে স্বীকৃত। যুগে যুগে দর্শনার্থীদের বিচরণভূমি হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে পর্যটন খাত মিসরের অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মিসরের যেসব স্থান পর্যটকদের আকর্ষণ করে এর অন্যতম হলো- তুরে সাইনা বা তুর পাহাড়। যেমন কোরআনে কারিমে এরশাদ হয়েছে,‘মূসা যখন মেয়াদ পূর্ণ করলো এবং নিজ স্ত্রীকে নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলো, তখন সে তুর পাহাড়ের দিকে এক আগুন দেখতে পেলো। সে নিজ পরিবারবর্গকে বললো,তোমরা অপেক্ষা করো। আমি এক আগুন দেখেছি, হয়তো আমি সেখান থেকে তোমাদের কাছে আনতে পারবো। কোনো সংবাদ অথবা আগুনের একটা জ্বলন্ত কাঠ,যাতে তোমরা উত্তাপ গ্রহণ করতে পারো। সুতরাং সে যখন আগুনের কাছে পৌঁছল,তখন ডান উপত্যকার কিনারায় অবস্থিত বরকতপূর্ণ ভূমির একটি বৃক্ষ থেকে ডাকা হলো-হে মূসা! আমিই আল্লাহ,জগৎসমূহের প্রতিপালক।’(সূরাঃ কাসাস,আয়াত-২৯-৩০)
তুর পাহাড়ে হযরত মূসা (আ.) আসমানি কিতাব তাওরাত লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তা’য়ালা সূরা আরাফে তা উল্লেখ করেছেন। এরশাদ হয়েছে,‘আমি মুসার জন্য ত্রিশ রাতের মেয়াদ স্থির করেছিলাম (এ রাতসমূহে তুর পাহাড়ে এসে ইতিকাফ করবে)। তারপর আরও দশ রাত বৃদ্ধি করে তা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত মেয়াদ চল্লিশ দিন হয়ে গেলো এবং মূসা তার ভাই হারুনকে বলল, আমার অনুপস্থিতিতে তুমি সম্প্রদায়ের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে,সবকিছু ঠিকঠাক রাখবে এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ করবে না। হযরত মূসা (আ.) যখন আমার নির্ধারিত সময়ে এসে পৌঁছল এবং তার প্রতিপালক তার সঙ্গে কথা বললেন, তখন সে বললো,হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দিন আমি আপনাকে দেখব। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কিছুতেই দেখতে পাবে না। তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করো। তা যদি আপন স্থানে স্থির থাকে,তবে তুমি আমাকে দেখতে পারবে। অতপর যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে তাজাল্লিফেললেন ( জ্যোতি প্রকাশ করলেন) তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেললো এবং মূসা (আ.) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলো। পরে যখন তার সংজ্ঞা ফিরে আসল, তখন সে বলল, আপনার সত্তা পবিত্র। আমি আপনার দরবারে তওবা করছি এবং (দুনিয়ায় কেউ আপনাকে দেখতে সক্ষম নয়- এ বিষয়ের প্রতি) আমি সবার আগে ঈমান আনছি।’(সূরাঃ আরাফ: ১৪২-১৪৩)
বনী ঈসরাইলরা যখন হযরত মূসা (আ.)কে বিশ্বাস করেনি,তারা আল্লাহর কথা নিজ কানে শ্রবণ করার শর্তারোপ করে,আর আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী মূসা (আ.) তাদের নিয়ে পাহাড়ে যান। সেখানে তারা আল্লাহ কথা শ্রবণ করেন। সেখানে তারা নতুন শর্তারোপ করেন যে,তারা আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখতে চান। না দেখা পর্যন্ত তারা মুসার প্রতি ঈমান আনবেন না। তখন আল্লাহর আজাব তাদেরকে গ্রাস করে। তারা সবাই মৃত্যু বরণ করে। হযরত মূসা (আ.) অনেক বিনয়ের সঙ্গে প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! এদেরকে আপনি জীবিত করে দিন। নতুবা আমি বনী ঈসরাইলদের কি জবাব দেবো। কার কাছে তাওহিদের দাওয়াত দেবো। অতপর আল্লাহ তা’য়ালা তার দোয়া কবুল করেন এবং সবাইকে পুনরায় জীবিত করে দেন।
প্রত্যেক নবী বিশেষ গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। আল্লাহর নবী মুসা (আ.)আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ লাভ করেছিলেন। মূসা (আ.) তুর পর্বতের পাদদেশ থেকে ঐশী শব্দ শুনতে পান এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন। ওই পাহাড়ের নাম সিনাই পর্বত। পাহাড়টি ছিলো মূসা (আ.)-এর ডান দিকে।কেননা তখন তিনি মাদিয়ান শহর থেকে মিসরের দিকে যাচ্ছিলেন। আল্লাহর সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথোপকথনের বিষয়ে পবিত্র কোরআনে এসেছে,‘আমি তাকে ডেকেছিলাম মূসা (আ.) তুর পাহাড়ের ডান দিক থেকে এবং অন্তরঙ্গ আলাপে তাকে নৈকট্য দান করেছি।’ (সূরা : মারিয়াম,আয়াত- ৫২)। এ আয়াতে হযরত মূসা (আ.)-এর সঙ্গে আল্লাহর সরাসরি কথোপকথনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এটা আল্লাহর দরবারে মূসা (আ.)-এর উচ্চ মর্যাদার প্রমাণ। আল্লাহ তা’য়ালা দুনিয়াতে তাঁর দেয়া জীবন-ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করার জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী রাসুল প্রেরণ করেছেন। যখনই কালিমার দাওয়াত পেশ করা হতো, তখনই তারা নানা অজুহাত, শর্তারোপ করতো। যা ঘটেছে হযরত মূসা (আ.) এর ক্ষেত্রেও। আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী মূসা (আ.) তার উম্মতের লোকদের নিয়ে তুর পাহাড়ে গেলে সেখানে যা ঘটে, তার বিবরণ উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন-আর যখন তোমরা বললে,হে মূসা,কস্মিনকালেও আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে (প্রকাশ্যে) দেখতে পাবো। বস্তুতঃ তোমাদিগকে পাকড়াও করলো বিদ্যুৎ। অথচ তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে। তারপর,মরে যাবার পর তোমাদিগকে আমি তুলে দাঁড় করিয়েছি, যাতে করে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নাও। (সুরা বাক্বারা : আয়াত ৫৫-৫৬)
হযরত মূসা (আ.)এর মূজেজা ছিলো তাঁর হাতের লাঠি। মু‘জেযা অর্থ মানুষের বুদ্ধিকে অক্ষমকারী। অর্থাৎ এমন কর্ম সংঘটিত হওয়া যা মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতা বহির্ভূত। (১) ‘মু‘জেযা’ কেবল নবীগণের জন্য খাছ এবং ‘কারামত’ আল্লাহ তাঁর নেককার বান্দাদের মাধ্যমে কখনো কখনো প্রকাশ করে থাকেন। যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। (২) মু‘জেযা নবীগণের মাধ্যমে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। পক্ষান্তরে জাদু কেবল দুষ্ট জিন ও মানুষের মাধ্যমেই হয়ে থাকে এবং তা হয় অদৃশ্য প্রাকৃতিক কারণের প্রভাবে। (৩) জাদু কেবল পৃথিবীতেই ক্রিয়াশীল হয়,আসমানে নয় কিন্তু মু‘জেযা আল্লাহর হুকুমে আসমান ও যমীনে সর্বত্র ক্রিয়াশীল থাকে। যেমন শেষনবী (সা.)-এর আঙ্গুলী সংকেতে আকাশের চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হয়েছিলো। (৪) মু‘জেযা মানুষের কল্যাণের জন্য হয়ে থাকে কিন্তু জাদু স্রেফ ভেল্কিবাজি ও প্রতারণা মাত্র এবং যা মানুষের কেবল ক্ষতিই করে থাকে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন,‘ফেরাউন ডুবে মারা গেছে আর মৃত্যুর পরও তার শরীর অক্ষত রাখা হবে,পরবর্তি সীমালংঘনকারীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে।’ ঐতিহাসিকগণ ১৮৯৮ সালে ফেরাউনের লাশ উদ্ধার করেন। যা আজ মিশরের কায়রোতে দ্যা রয়েল মমী হলে একটি কাচের সিন্দুকের মধ্যে রয়েছে। এর দৈর্ঘ ২০২ সেন্টিমিটার। ৩১১৬ বছর পানির নীচে থাকা সত্ত্বেও তার লাশে কোন পচন ধরে নি। ফেরাউনের মৃত দেহটিকে ১৮৮১ সালে মিশরের এক নদীর উপত্যকায় (পাহাড়ের মাঝখানে, যেখান দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়েছে) পাওয়া গিয়েছিলো বলে জানা যায় কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ১৪০০ বছর পূর্বেই পবিত্র কোরআনে ফেরাউনের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিকদের মতে,ফেরাউনের দেহটি যখন পাওয়া যায়, তখন ঐ দেহটির বয়স হয়েছিলো প্রায় ৩০০০ বছরের মতো।
ফেরাউনকে তাদের সকল দলবলসহ নীলনদের তলদেশে ডুবিয়েছিলেন। ফেরাউনের লাশ এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে তুরস্কের কারাগারে। মূসা (আ.) এর হাতের লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ করলে আল্লাহর হুকুমে তা অজগর সাপ হয়ে যেতো। আল্লাহর একত্ববাদের বিশ্বাস অবিশ্বাসির মাঝে আনানোর জন্য এসকল মোজেজা হযরত মূসা (আ.) কে আল্লাহ পাক দিলেও তা ফেরাউনসহ তার কওমের লোকজন তাকে যাদুকর বলে অভিহিত করেছিলেন। এ কারণে আল্লাহ তা’য়ালা তাদের সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।
আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর আদি ৬টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ,‘আদ, ছামূদ,লূত্ব ও কওমে মাদইয়ানের বর্ণনার পর ষষ্ঠ গযবপ্রাপ্ত জাতি হিসাবে কওমে ফেরাঊন সম্পর্কে আল্লাহ পাক কোরআনের ২৭টি সূরায় ৭৫টি স্থানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। কোরআনে সর্বাধিক আলোচিত বিষয় হ’ল এটি। যাতে ফেরাঊনের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ও তার যুলুমের নীতি-পদ্ধতি সমূহ পাঠকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় এবং এযুগের ফেরাঊনদের বিষয়ে উম্মতে মুহাম্মাদী হুঁশিয়ার হয়। ফেরাঊনের কাছে প্রেরিত নবী মূসা ও হারুন (আ.) সম্পর্কে কোরআনে সর্বাধিক আলোচনা স্থান পেয়েছে। মূসা (আ.) ও ফেরাঊনের ঘটনা কোরআনে বারবার উল্লেখ করার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, এলাহী কিতাবধারী ইহুদী-নাছারাদের পিছনের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং শেষনবীর উপরে ঈমান আনার পক্ষে যৌক্তিকতা উপস্থাপন করা। উল্লেখ্য যে,পরবর্তী রাসূল দাঊদ, সুলায়মান ও ঈসা (আ.)সবাই ছিলেন বনী ঈসরাইল-এর সম্প্রদায়ভুক্ত এবং তাদের প্রতি প্রেরিত নবী। হযরত মূসা (আ.) ছিলেন এঁদের সবার মূল ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। উল্লেখ্য যে,কওমে মূসা ও ফেরাঊন সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের মোট ৪৪টি সূরায় ৫৩২টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
অন্যান্য নবীদের পরীক্ষা হয়েছে সাধারণত নবুয়ত লাভের পরে কিন্তু মূসার পরীক্ষা শুরু হয়েছে তার জন্ম লাভের পর থেকেই। বস্তুতঃ নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে ও পরে তাঁর জীবনে বহু পরীক্ষা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা’য়ালা হযরত মূসা (আ.) কে শুনিয়ে বলেন,‘আর আমি তোমাকে অনেক পরীক্ষায় ফেলেছি’ (সূরাঃ ত্বহা,আয়াত- ২০/৪০)। নবুয়ত লাভের পূর্বে তাঁর প্রধান পরীক্ষা ছিলো তিনটি। যথাঃ (১) হত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া (২) মাদিয়ানে হিজরত (৩) মাদিয়ান থেকে মিসর যাত্রা। অতঃপর নবুয়ত লাভের পর তাঁর পরীক্ষা হয় প্রধানতঃ চারটি-(১) জাদুকরদের মোকাবিলা (২) ফেরাঊনের যুলুমসমূহ মোকাবিলা (৩) সাগরডুবির পরীক্ষা (৪) বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযান।
আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আ.)একজন বড়মাপের দাঈ ও মুজাহিদ ছিলেন। একজন দাঈ হিসেবে তিনি অসংখ্য গুণের আধার ছিলেন। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পৃথিবীতে আগমন করেও যিনি সারাজীবন দ্বীনে হকের উপর অবিচল থাকার অভিপ্রায় নিয়ে মানুষকে যাবতীয় যুলুম নির্যাতন হতে রক্ষা করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইসলামী দাওয়াতকে মানুষের মাঝে তুলে ধরার জন্য তিনি স্থান,কাল,পাত্র ভেদে বিভিন্ন হিকমতপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। এমনকি, দাওয়াতকে ফলপ্রসূ করার নিমিত্তে আল্লাহর সাহায্য ও তাঁর প্রতি পূর্ণ নির্ভর হওয়ার পাশাপাশি সমসাময়িক যুগশ্রেষ্ঠ উপকরণ ব্যবহার করতেও দ্বিধা করেননি। আল্লাহ তাঁর সাথে সরাসরি কথা বলে তাঁকে মর্যাদাবান করেছেন।
সকল নবী রাসূলের দাওয়াতের মুল বিষয় তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। অনুকুল প্রতিকূল সর্বাবস্থায় দ্বীনে হকের উপর অবিচল থেকেছে ইসলামের প্রত্যেক নবী। নবীগণ ছিলেন মহান আল্লাহর পুত পবিত্র দূত। তাঁরা দিকভ্রান্ত মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। বলে দিয়েছেন অনন্ত জান্নাতের পথ। জান্নাতের নিয়ামত অসীম। মানুষ যা কল্পনাও করতে পারবে না তার চেয়ে ঢের নিয়ামত সেখানে। মহান আল্লাহর এসব নবীগণ তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী উম্মতের মাঝে দ্বীনের কাজ করেছেন। অবশেষে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।পবিত্র কোরআনে হযরত মূসা (আ.) এর নাম অন্যান্য নবীদের তুলনায় বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হয় যে,মূসা (আ.) ১২০ বছর বেঁচে ছিলেন। হযরত মূসা (আ.) এর সম্প্রদায়ের নাম ছিলো বনী ঈসরাঈল। বলা হয় তাঁর মূজেজাসমূহ বিগত অন্যান্য নবী-রসূলগণের তুলনায় সংখ্যায় বেশি। প্রকাশের বলিষ্ঠতার দিক দিয়েও ছিলো অধিক। এমনিভাবে তাঁর সম্প্রদায় বনী-ঈসরাঈলের মূর্খতা এবং হঠকারিতাও বিগত উম্মত বা জাতিসমূহের তুলনায় বেশি কঠিন।তিনি হযরত শোয়েব (আ.) এর যুগে ছিলেন। হযরত মূসা (আ.) এর কবর সম্পর্কে বিভিন্ন দাবি আছে কিন্তু বেশীরভাগ পন্ডিতরা দাবি করেন যে,হযরত মূসা (আ.) এর কবর ঈসরাইলের মধ্যে রয়েছে।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট