আদর্শ রাষ্ট্রপ্রধান ও পরাক্রমশালী বাদশা হযরত দাউদ (আ.)

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। যার সঠিক সংখ্যার কোনো সুস্পষ্ট তথ্য নেই। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী ২৫ জন্য নবী ও রাসূলের কথা বিদ্যমান। কোরআনের বর্ণনা মতে এ সকল নবী-রাসূলদের মধ্যে তিনি যাদেরকে নবুয়ত দানের পাশাপাশি হিকমত প্রদান করেছেন,তাদেরে মধ্যে হয়রত দাউদ (আ.) অন্যতম।

দাউদ বনী ইসরাঈলের দ্বাদশ গোত্রের মধ্যে ইয়াহুদার বংশের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রা.) ওহাব ইবনে মুনাব্বেহ-এর মাধ্যমে দাউদের চেহারা/গঠনের বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বেটে,ক্ষুদ্রাকৃতি,নীল চোখ, দেহে অতি অল্প পরিমাণ লোম ছিল। মুখের চেহারা থেকে অন্তরের পবিত্রতা দেখা যেত। তাঁর পিতার নাম ঈশা। দাউদের সাথে বনী ইসরাইলদের বন্ধুত্বের কারণে তালুতের পরেই তিনি শাসন ক্ষমতা পেয়ে যান। মহান আল্লাহ তাকে নবুয়তও প্রদান করেন। পূর্বে বনী ইসরাইলের এক বংশের কাছে ছিল শাসন ক্ষমতা আর অন্য বংশের কাছে ছিলো নবুয়ত। দাউদ প্রথম দুটোই একসাথে পান। তিনি মহান আল্লাহর নবীও ছিলেন, আবার বাদশাহও ছিলেন। তিনি বনী ইসরাইলীদের সামাজিক ও সামগ্রিক জীবন দেখাশুনা করতেন। এই জন্য মহান আল্লাহ তাকে খলীফা হিসাবে আখ্যায়িত করলেন। দাউদ মুসার শরীয়তকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন।‘যাবুর’ কিতাবটি মহান আল্লাহর প্রশংসায় ভরপুর ছিলো। দাউদের গলায় মহান আল্লাহ যাদুর সুর দান করেছিলেন যে,তেলাওয়াতের সময় মানুষ তো অবশ্যই পাখি,জীব-জন্তু পর্যন্ত অভিভূত হযে যেতো।‘যাবুর’ শব্দের অর্থ পারা বা খন্ড। মহান আল্লাহর দয়ায় তার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি কম/বেশি যাই থাকুক না কেন, সাফল্য সবসময় তার পক্ষেই থাকতো। সুতরাং অল্প সময়ের মধ্যে তার সাম্রাজ্য সিরিয়া,ইরাক,ফিলিস্তিন এবং পূর্ব জর্ডানের সমস্ত এলাকা তার অধীনে এসে যায়। হেজাযের কিছু অংশ তার নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রজাদের তার সম্পর্কে ধারণা ছিলো যে,যেকোন জটিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবার মত ক্ষমতা তার আছে।

হযরত দাউদ (আ.) ছিলেন বনি ইসরাইলের নবী। মহান আল্লাহ তা’য়ালা যে নবীদের মহান কিতাব দিয়েছিলেন, হজরত দাউদ (আ.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। দাউদ (আ.)-কে আল্লাহ যাবুর নামক কিতাব দান করেছিলেন। যাবুর কিতাবের অন্যতম দুটি বৈশিষ্ট্য ছিলো,নন্দিত ছন্দ ও আল্লাহ তা’য়ালার প্রশংসার বিবরণ। দাউদ (আ.)-এর ছিলো সকাল-সন্ধ্যা মহান প্রভুর প্রশংসাপাঠের আমল ও মোহনীয় সুর। সুর ও ছন্দ, দুটোই আল্লাহ তা’য়ালার বিশেষ নিয়ামত। ছন্দ যেমন প্রাণকে আন্দোলিত করে, সুরও তেমনি হৃদয়ে উচ্ছ্বাস জাগায়, প্রাণিত করে। প্রত্যেক নবীকে আল্লাহ স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছিলেন। তেমনি দাউদকে দিয়েছিলেন বীরত্ব, সাহসিকতা, খেলাফত, বিচারিক দক্ষতা, পশুপাখির ভাষা বোঝার ক্ষমতা ও সুরলহরী।

দাউদ (আ.) একজন দক্ষ কর্মকার ছিলেন। বিশেষ করে শত্রুর মোকাবিলার জন্য উন্নত মানের বর্ম নির্মাণে তিনি ছিলেন একজন কুশলী কারিগর। যা বিক্রি করে তিনি সংসার যাত্রা নির্বাহ করতেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিজের ভরণপোষণের জন্য কিছুই নিতেন না। বনী ঈস্রাঈলদের জন্য শনিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন এবং ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট ও পবিত্র দিন। এ দিন তাদের জন্য মৎস্য শিকার নিষিদ্ধ ছিল। তারা সমুদ্রোপকুলের বাসিন্দা ছিলো এবং মৎস্য শিকার ছিলো তাদের পেশা। ফলে দাউদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই তারা ঐদিন মৎস্য শিকার করতে থাকে। এতে তাদের উপরে আল্লাহর পক্ষ হতে ‘মস্থ’বা আকৃতি পরিবর্তনের শাস্তি নেমে আসে এবং তিনদিনের মধ্যেই তারা সবাই মৃত্যু মুখে পতিত হয়। আল্লাহ বলেন ” তোমরা তাদেরকে ভালরূপে জেনেছ, যারা শনিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছিল। আমি বলেছিলাম: তোমরা লাঞ্ছিত বানর হয়ে যাও। অতঃপর আমি এ ঘটনাকে তাদের সমসাময়িক ও পরবর্তীদের জন্য দৃষ্টান্ত এবং আল্লাহভীরুদের জন্য উপদেশ গ্রহণের উপাদান করে দিয়েছি।” (সূরাঃ বাকারাহ-৬৫-৬৬)।

বাইবেলের পুরানো নিয়েমে (ওল্ড টেস্টামেন্ট) দাউদকে বলা হয়েছে সেন্ট লুইস ডেভিড। দাউদের মাজার এখনো আছে যা ইহুদীরা সংরক্ষণ করে রেখেছেন। সে মাজারের গেটে এখনো লেখা আছে ‘কিং সেন্ট ডেভিড’। আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন,”তারপর ঈমানদাররা আল্লাহর হুকুমে জালূতের বাহিনীকে পরাজিত করে দিল এবং দাউদ জালূতকে হত্যা করল। আর আল্লাহ দাউদকে দান করলেন রাজ্য ও অভিজ্ঞতা। আর তাকে যা চাইলেন শিখালেন। আল্লাহ যদি একজনকে অপরজনের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে গোটা দুনিয়া বিধ্বস্ত হয়ে যেতো কিন্তু বিশ্ববাসীর প্রতি আল্লাহ একান্তই দয়ালু, করুণাময়।” (সুরা বাকারা-২৫১)

আল্লাহ প্রত্যেক নবীকে স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। ১. আল্লাহ দাঊদ (আ.)-কে আধ্যাত্মিক ও দৈহিক শক্তিতে বলিয়ান করে সৃষ্টি করেছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন,‘স্মরণ করো,আমার বান্দা দাঊদকে। সে ছিলো শক্তিশালী এবং আমার প্রতি সদা প্রত্যাবর্তনশীল’ (ছোয়াদ ৩৮/১৭)। নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন প্রজ্ঞা,স্বাস্থবান ,আমানতদারী,ন্যায়নিষ্ঠা ও উন্নতমানের বাগ্মীতা। দাউদ(আ.) এর সবগুলো গুন ছিল। হযরত দাউদ (আ.)নানাবিধ মানবিক গুণে ভূষিত ছিলেন। তিনি মহান আল্লাহর আইনে ইহকাল ও পরকাল দুটোই সফলভাবে পরিচালনা করেন। যে শাসক মহান আল্লাহর প্রতি অনুগত হন,মহান আল্লাহ দুনিয়ার সৃষ্টিকে, সেই শাসকের অণুগত করে দেন। নবী-রাসূলরা আল্লাহর মনোনীত ও প্রেরিত পুরুষ। পৃথিবীর বুকে আল্লাহর একত্ববাদের প্রতিষ্ঠা ও তাঁর দ্বীন প্রচারের জন্য আল্লাহ তাঁদের নির্বাচিত করেছেন।

বোখারী শরীফে আছে যাবুর কিতাব হযরত দাউদ (আ.) অতিদ্রুত তেলাওয়াত বা আবৃত্তি করতে পারতেন। এমনকি তিনি ঘোড়ার পিঠের গদী বাঁধতে যতটুকু সময় লাগতো,এসময়ের মধ্যেই যাবুর আবৃত্তি করে শেষ করতে পারতেন। সূরা আম্বিয়া: ৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এই বর্ণনা দিয়েছেন,“আল্লাহপাক পাহাড়-পর্বত ও পশু-পাখিকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলেন। তারা তাঁর সাথে তসবিহ পাঠ করতো বা আল্লাহর স্মরণসূচক আবৃত্তি করতো। বৃক্ষ,পাথর ও শিলাখন্ড থেকেও তাসবিহ ধ্বনিত হতো।””বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে মুহাম্মাদ বলেন:মহান আল্লাহর নিকটে সর্বাধিক পছন্দনীয় হল দাউদের সালাত এবং সর্বাধিক পছন্দনীয় সিয়াম ছিলো দাউদের সিয়াম। তিনি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত ঘুমাতেন। অতঃপর এক তৃতীয়াংশ সালাতে কাটাতেন এবং শেষ ষষ্টাংশে নিদ্রা যেতেন। তিনি একদিন অন্তর একদিন সিয়াম রাখতেন। শত্রুর মোকাবিলায় তিনি কখনো পশ্চাদপসরণ করতেন না”।

‘‘ল’’ শক্তি ও রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী নবী ছিলেন মাত্র দু’জন। তাঁরা হলেন পিতা ও পুত্র দাঊদ ও সোলায়মান (আ.)। বর্তমান ফিলিস্তীন সহ সমগ্র ইরাক ও শাম (সিরিয়া) এলাকায় তাঁদের রাজত্ব ছিলো। পৃথিবীর অতুলনীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তাঁরা ছিলেন সর্বদা আল্লাহর প্রতি অনুগত ও সদা কৃতজ্ঞ। সেকারণ আল্লাহ তার শেষনবীকে সান্ত¦না দিয়ে বলেন,‘তারা যেসব কথা বলে তাতে তুমি সবর করো এবং আমার শক্তিশালী বান্দা দাঊদকে স্মরণ কর। সে ছিলো আমার প্রতি সদা প্রত্যাবর্তনশীল’ (ছোয়াদ ৩৮/১৭)। দাঊদ হলেন আল্লাহর একমাত্র বান্দা, যাকে খুশী হয়ে পিতা আদম স্বীয় বয়স থেকে ৪০ বছর কেটে তাকে দান করার জন্য আল্লাহর নিকটে সুফারিশ করেছিলেন এবং সেমতে দাঊদের বয়স ৬০ হতে ১০০ বছরে বৃদ্ধি পায়। উল্লেখ্য যে,হযরত দাঊদ (আ.) সম্পর্কে কোরআনের ৯টি সূরায় ২৩টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি ছিলেন শেষনবী (সা.)-এর আগমনের প্রায় দেড় হাযার বছরের পূর্বেকার নবী দাঊদ কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেয়েই শক্তিশালী হননি, বরং তিনি জন্মগতভাবেই ছিলেন দৈহিকভাবে শক্তিশালী এবং একই সাথে ঈমানী শক্তিতে বলিয়ান।

বুখারী ও মুসলিমের এক হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেন, আল্লাহ তা‘য়ালার নিকটে সর্বাধিক পসন্দনীয় সালাত হলো দাঊদ (আ.)-এর সালাত এবং সর্বাধিক পসন্দনীয় সিয়াম ছিলো দাঊদ (আ.)-এর ছিয়াম। তিনি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত ঘুমাতেন। অতঃপর এক তৃতীয়াংশ ছালাতে কাটাতেন এবং শেষ ষষ্টাংশে নিদ্রা যেতেন। তিনি একদিন অন্তর একদিন ছিয়াম রাখতেন। শত্রুর মোকাবিলায় তিনি কখনো পশ্চাদপসরণ করতেন না’।

অতএব দাঊদের কণ্ঠস্বর শোনা, তাঁর অনুগত হওয়া ও আল্লাহর বাণী যবূরের আয়াতসমূহের প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করা পাহাড় ও পক্ষীকুলের জন্য মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয়। শেষনবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর জন্য বনের পশু, পাহাড়, বৃক্ষ তাঁর সামনে মাথা নুইয়েছে ও ছায়া করেছে,এমনকি স্বস্থান থেকে উঠে এসে বৃক্ষ তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়েছে,এগুলি সব চাক্ষুষ ঘটনা।একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর তিন সাথী আবুবকর, ওমর ও ওছমান একটি পাহাড়ে উঠলেন। তখন পাহাড়টি কাঁপতে শুরু করল। নবী করিম (সা.) পাহাড়টিকে ধমক দিয়ে বললেন, স্থির হও! তোমার উপরে আছেন একজন নবী, একজন ছিদ্দীক ও দু’জন শহীদ’। এর দ্বারা উদ্ভিদ ও পর্বতের জীবন ও অনুভূতি প্রমাণিত হয়। অতএব আল্লাহর অপর নবী দাঊদ (আঃ)-এর জন্য পাহাড়, পক্ষী, লৌহ ইত্যাদি অনুগত হবে, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। যদিও বস্ত্তবাদীরা চিরকাল সন্দেহের অন্ধকারে থেকেছে, আজও থাকবে। আল্লাহর রহমত না হ’লে ওরা অন্ধকারের ক্রিমিকীট হয়েই মরবে।

ইমাম বাগাভী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস,ক্বাতাদাহ ও যুহরী থেকে বর্ণনা করেন যে, একদা দু’জন লোক হযরত দাঊদের নিকটে একটি বিষয়ে মীমাংসার জন্য আসে। তাদের একজন ছিলো ছাগপালের মালিক এবং অন্যজন ছিল শস্য ক্ষেতের মালিক। শস্যক্ষেতের মালিক ছাগপালের মালিকের নিকট দাবী পেশ করল যে, তার ছাগপাল রাত্রিকালে আমার শস্যক্ষেতে চড়াও হয়ে সম্পূর্ণ ফসল বিনষ্ট করে দিয়েছে। আমি এর প্রতিকার চাই। সম্ভবতঃ শস্যের মূল্য ও ছাগলের মূল্যের হিসাব সমান বিবেচনা করে হযরত দাঊদ (আঃ) শস্যক্ষেতের মালিককে তার বিনষ্ট ফসলের বিনিময় মূল্য হিসাবে পুরা ছাগপাল শস্যক্ষেতের মালিককে দিয়ে দিতে বললেন। বাদী ও বিবাদী উভয়ে বাদশাহ দাঊদ-এর আদালত থেকে বেরিয়ে আসার সময় দরজার মুখে পুত্র সুলায়মানের সাথে দেখা হয়। তিনি মোকদ্দমার রায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা সব খুলে বললো। তিনি পিতা দাঊদের কাছে গিয়ে বললেন, আমি রায় দিলে তা ভিন্নরূপ হ’ত এবং উভয়ের জন্য কল্যাণকর হতো। অতঃপর পিতার নির্দেশে তিনি বললেন,ছাগপাল শস্যক্ষেতের মালিককে সাময়িকভাবে দিয়ে দেওয়া হউক। সে এগুলোর দুধ, পশম ইত্যাদি দ্বারা উপকার লাভ করুক। পক্ষান্তরে শস্যক্ষেতটি ছাগপালের মালিককে অর্পণ করা হউক। সে তাতে শস্য উৎপাদন করুক। অতঃপর শস্যক্ষেত্র যখন ছাগপালে বিনষ্ট করার পূর্বের অবস্থায় পৌঁছে যাবে, তখন তা ক্ষেতের মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং ছাগপাল তার মালিককে ফেরৎ দেওয়া হবে’। হযরত দাঊদ (আ.) রায়টি অধিক উত্তম গণ্য করে সেটাকেই কার্যকর করার নির্দেশ দেন। এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,‘আর স্মরণ কর দাঊদ ও সোলায়মানকে, যখন তারা একটি শস্যক্ষেত সম্পর্কে বিচার করেছিল, যাতে রাত্রিকালে কারু মেষপাল ঢুকে পড়েছিলো। আর তাদের বিচারকার্য আমাদের সম্মুখেই হচ্ছিলো’। ‘অতঃপর আমরা সুলায়মানকে মোকদ্দমাটির ফায়ছালা বুঝিয়ে দিলাম এবং আমরা উভয়কে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম’ (আম্বিয়া ২১/৭৮-৭৯)। বস্তুতঃ উভয়ের রায় সঠিক ও সুধারণা প্রসূত ছিলো কিন্তু অধিক উত্তম বিবেচনায় হযরত দাঊদ স্বীয় পুত্রের দেওয়া পরামর্শকেই কার্যকর করার নির্দেশ দেন। আর সেকারণেই আল্লাহ উভয়কে সমগুণে ভূষিত করে বলেছেন যে, ‘আমরা উভয়কে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছি’। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বিচারক উত্তম মনে করলে তার পূর্বের রায় বাতিল করে নতুন রায় প্রদান করতে পারেন।

হযরত দাউদ (আ.) হযরত ইয়াকুব (আ.) এর পুত্র ইয়াহুদের বংশধর। তিনি রাজ্য লাভের চল্লিশ বছর পরে নবুয়াতী লাভ করেন। তিনি প্রথম জীবনে ছিলেন একজন দরিদ্র মেষ পালক। পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তা’য়ালা তাকে অসিম যোগ্যতা দান করে যার মাধ্যমে তিনি নিজ প্রতিভা বিকাশে সুযোগ লাভ করেন। তাঁর যোগ্যতার অংশ বর্ণনা পুথি-পুস্তকে লিখিত রয়েছে। তাই এক কথায় তাকে বলতে হয় তিনি ছিলেন পরাক্রমশালী বাদশা ও শ্রেষ্ঠ নবীদের একজন। তিনি ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠ বিদ্যান। মুদ্ধিমান বিচক্ষন। রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে ছিলেন অতুলনীয়। বিচারের ক্ষেত্রে ছিলেন কঠোর ইনসাফগার। তাঁর রাজ্য ছিলো বিশাল। পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ ছিলো তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা’য়ালা হযরত দাউদ (আ.) কে নিজ খলিফা বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

হযরত দাউদ (আ.) কে আল্লাহ তা’য়ালা এমন মধুর কষ্ঠ দান করেছিলেন, যা তুলনা বিহীন। তিনি যখন তাঁর প্রতি যাবুর কিতাব তেলাওয়াত করেন, নদীর প্রবাহিত পানি থেকে যায়। বনের পশু পক্ষী তাঁর পাশে জমায়েত হয়ে তেলাওয়াত শুনত। গাছপালা ও পাহাড় পর্বত তাঁর সুরের সাথে দুলত। মনে হত যেন তাঁর সাথে শ্বর মিলিয়ে তেলাওয়াত করছে। হযরত দাউদ (আ.) এর তেলাওয়াতের আওয়াজ চল্লিশ মাইল পর্যন্ত পৌঁছাত। এ চল্লিশ মাইলের সকল প্রাণী তাঁর তেলায়াতের সময় মনমুগ্ধের ন্যায় দুলত এবং মুখ মিলিয়ে তেলাওয়াতে অংশগ্রহণ করতো। ধর্মদ্রোহীরা এ তেলাওয়াত শুনলে বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যেতো। হযরত দাউদ (আ.) কে আল্লাহ তা’য়ালা আর এক বিরাট ক্ষমতার অধিকারি করেছিলেন। সেটা হলো তিনি লোহা হাতে নিলে নরম মোমের মত হযে যেত। তিনি সে লোহা দিযে ইচ্ছেমত অস্ত্র ও লৌহবর্ম তৈরি করে নিতেন। পৃথিবীতে তিনি সর্বপ্রথম লৌহবর্ম তৈরি করেন। যা আর কার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই তিনি লৌহবর্ম ও অন্যান্য লৌহজাত আসবাবাদী তৈরি করে বিক্রয় করতেন। উক্ত আসবাব বিক্রয়ের টাকা গরিবদের মধ্যে বিতরণ করতেন। আত্নীয় স্বজনকে দিতেন এবং বিক্রয় করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি রাজকোষ থেকে কোন অর্থ গ্রহণ করতেন না। হযরত দাউদ (আঃ) এর ন্যায় আর একজন আর্দশ রাষ্ট্রপ্রধান পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করছেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সকল নবী রাসূলগণকে আল্লাহ তা’য়ালা কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন করে থাকেন। এটাই বিচারিত নিয়ম। যার উপর যত বড় কঠিন পরিক্ষা আসে, তাকে সে পরিমাণ উচ্চমর্যাদার অধিকারি করে দেওয়া হয়। এ পরীক্ষার নাম এবতেলায়ে আম্বিয়া। হযরত দাউদ (আ.) কেও সে নিয়মের আওতায় পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এক নবীর পক্ষে অন্য নবীর মান-মর্যদা সম্পর্কে অবগত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। সে হিসাবে হযরত দাউদ (আঃ) যখন হযরত ইব্রাহিম হযরত ইসমাইল ও হযরত আইউব (আঃ) এর উচ্চ মর্যাদার খবর অবগত হলেন। তিনি তখন আল্লাহত দরবারে নিজের মান মর্যদার উন্নতির জন্য আবেদন করলেন। আল্লাহর পক্ষে তাকে অবগত হল যে, মান মর্যদা উন্নতির জন্য কঠিন পরীক্ষা দিত হয়। তখন হযরত দাউদ (আ.) আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করে বললেন, হে দয়াময়! আমাকে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন করার ক্ষেত্রে আপনি যে কোন পরীক্ষার সম্মুখীন করুন। আমি তা স্বানন্দে কবুল করে নিব এবং আপানার রহমত যদি আমার সাথে থাকে তবে আমি সে পরিক্ষায় অবশই উত্তির্ন হব। আল্লাহ তা’য়ালা হযরত দাউদ (আ.) এর ফরিয়াদ কবুল করলেন এবং তাকে পরীক্ষার সম্মুখীন করে দিলেন।
একদা হযরত দাউদ (আ.) নিজ এবাদাতখানায় বসে ইবাদাত করছিলেন। এমন সময়ে একটি নতুন ধরনের পাখি এসে তাঁর ইবাদাত খানায় ঢুকলো।পাখিটি দেখতে কবুতরের ন্যায় ছিলো। তাঁর গায়ের রং ছিলো সোনালী বর্ণের। তাঁর পাখা পা ঠোট ছিল সৌন্দর্যমন্ডিত। হযরত দাউদ (আ.) পাখিটি দেখে অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। পাখিটি তাঁর নিকট আসল। তখন তিনি পাখিটি ধরার জন্য অগ্রসর হলেন। পাখিটি তখন একটু দূরে সরে গেল। তিনি আর একটু অগ্রসর হলেন। পাখিটি আর একটু দূরে সরে গেলো। এভাবে হযরত দাউদ (আ.) অগ্রসর হচ্ছিলেন আর পাখিটিও খানিক দূরে সরে সরে তাকে ঘর থেকে বের করে নিল। অতপর হযরত দাউদ (আঃ) পাখিটি ধরার জন্য বে খায়াল হয়ে পাখির পিছনে ছুটতে আরম্ভ করলেন। এভাবে অগ্রসর হতে হত তিনি সুন্দর ফুল বাগানের মাঝে এসে পৌঁছলেন তখন পাখিটি উধাও হয়ে গেলো। তখন তাঁর চেতনা ফিরে এল। তিনি নিজেকে অসহায় ভাবতে লাগলেন।

কোথায় কিভাবে তিনি এসেছেন কিছুই তাঁর স্বরনে আসছে না। তিনি সেখানে অনেক ক্ষন দাঁড়িয়ে রইলেন। অতপর একজন মালির সাথে তাঁর দেখা হল তিনি যখন মালি কে জিজ্ঞাসা করলেন,এ বাগানের মালিক কে? মালি উত্তর দিলো এ বাগানের মালিক একজন মহিলা। তাঁর নাম বতশা আফিয়া। তিনি বাগানের ওপারে সুরম্য অট্টলিকায় বসবাস করনে। হযরত দাউদ (আ.) বাগানের মধ্যে হেটে অপর প্রান্তে গিয়ে দেখেন বাগান সংলগ্ন এক হাউজে এক সুন্দর মহিলা গোসল করছে। এ সুন্দরি মহিলার নাম ছিলো বতশা আফিয়া। বহু ঘটনা অতিবাহিত হওয়ার পর একসময় বতশার নিকট হযরত দাউদ (আ.) বিয়ের পয়গাম প্রেরণ করেন। বতশা নিজ জীবনের ভবিষ্যত চিন্তা করে বিয়েতে রাজি হয়। তখন হযরত দাউদ (আ.) একদিন দরবারের লোকজন নিয়ে বতশাকে বিয়ে করে নিজ মহলে নিযে আসেন। ইতোপূর্বে হযরত দাউদ (আ.) নিরানব্বই শাদী করেছিল। এবার বতশাকে নিয়ে স্ত্রীর সংখ্যা একশতে পরিপূর্ণ হল। হযরত দাউদ (আ.) এর শেষ স্ত্রীর বতশার গর্ভেই বিশ্বখ্যাত বাদশা ও সমগ্র পৃথিবীর একছত্র অধিপতি হযরত সোলায়মান (আ.) জন্মগ্রহণ করেন।

হযরত আদম (আ)-এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা প্রসঙ্গে পূর্বোল্লেখিত হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে যে,আল্লাহ যখন আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাঁর সন্তানদের বের করেন তখন হযরত আদম (আ) তাদের মধ্যে সকল নবীকে দেখতে পান। তাদের মধ্যে একজনকে অত্যন্ত উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট দেখে তিনি বলেন, হে আল্লাহ! ইনি কে? আল্লাহ জানালেন, এ তোমার সন্তান দাউদ। আদম (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার প্রতিপালক! তার আয়ু কত? আল্লাহ তা’য়ালা। জানালেন, ষাট বছর। আদম (আ) বললেন, হে পরোয়ারদিগার! তার আয়ু বাড়িয়ে দিন। আল্লাহ জানালেন, বৃদ্ধি করা যাবে না; তবে তোমার নিজের আয়ু থেকে নিয়ে বাড়িয়ে দিতে পারি। হযরত আদমের নির্ধারিত আয়ু ছিলো এক হাজার বছর। তা থেকে নিয়ে দাউদ (আ)-এর আয়ু আরও চল্লিশ বছর বাড়িয়ে দেয়া হল। যখন হযরত আদমের আয়ু শেষ হয়ে আসে তখন মৃত্যুর ফিরিশতা আসেন। আদম (আ.)বললেন, আমার আয়ুর তো এখনো চল্লিশ বছর বাকী। দাউদ (আ)-কে দেয়া বয়সের কথা তিনি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলেন। এভাবে আল্লাহ আদম (আ)-এর আয়ু এক হাজার বছর এবং দাউদ (আ)-এর আয় একশ পূর্ণ করে দেন। এ হাদীসটি ইমাম আহমদৃ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী, ইব্ন খুযায়মা, ইবনে হিব্বান ও হাকিম থেকে বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী একে সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন এবং হাকিম একে মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী আছে বলে উল্লেখ করেছেন। আদম (আ.)-এর আলোচনা প্রসঙ্গে এ সম্পর্কে বিশদভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হযরত দাউদ (আ.) কে ইসলামে নবী ও আল্লাহর দূত হিসাবে সম্মান করা হয় এবং প্রাচীন ইসরায়েল রাজ্যের একজন ধার্মিক, ঐশ্বরিকভাবে অনুমোদিত রাজা হিসাবে ইসলামে সম্মানিত। অধিকন্তু, আল্লাহর নিকট থেকে যবুর কিতাব প্রাপ্তির জন্য মুসলমানরা দাউদকে সম্মান করে। কোরআনে দাউদ নবীর কথা ষোলবার উল্লেখ করা হয়েছে, দাউদ ইসলামী ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মদ এর পূর্ববর্তী নবীদের যোগসূত্র হিসাবে উপস্থিত হয়েছেন। যদিও তাকে সাধারণত “আইন দানকারী” নবী হিসাবে বিবেচনা করা হয় না (উলু উল-আযম), ইসলামী চিন্তায় “তিনি প্রান্তিক ব্যক্তিত্ব থেকে অনেক দূরে”। পরবর্তীকালে ইসলামী ঐতিহ্যে তিনি নামাজ ও রোজার প্রতি কড়াকড়ির জন্য প্রশংসিত হন। তিনি আদর্শবান ন্যায়পরায়ন শাসক এবং পৃথিবীতে ঈশ্বরের কর্তৃত্বের প্রতীক হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছেন, তিনি একধারে একজন রাজা এবং একজন নবী ছিলেন। ইসলামী জেরুজালেমের ধর্মীয় স্থাপত্যকলায় দাউদের উপস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সমস্ত নবীদের দীন-ধর্মই ছিলো ইসলাম। কোনো নবীই নতুন করে কোনো ধর্ম প্রবর্তন করেননি। আদম থেকে মুহাম্মদ সবার দীন ছিল একটাই। তবে তাদের শরিয়ত বা আইন কানুনে পার্থক্য ছিলো।কিন্তু নবির মৃত্যুর কয়েক প্রজন্ম পরে নবিদের ঘনিষ্ঠদের মৃত্যুর পরে কিছু কুচক্রীরা বিভিন্ন নামে ধর্ম বানায়। দাউদ (আ.)-কে ইহুদিরা অনুসরণের দাবি করে। যদিও তাঁর আনীত জীবনবিধান থেকে তাঁরা হাজার মাইল দূরে।

হযরত দাউদ (আ.) এর ইন্তেকালের কিছুদিন পূর্বে একদা হযরত জিব্রাইল (আ.) একটি সিন্দুক নিযে হযরত দাউদ (আ.) এর নিকট উপস্থিত হন। অতপর তিনি হযরত দাউদ (আ.) কে বলেন, হে আল্লাহর খলিফা! আপনি রাজ্যময় ঘোষণা দিন যে, এই সিন্দুকের মধ্যে কি আছে? সে কথা সঠিক ভাবে যে বলতে পারবে তাকেই খেলাফত ও রাজ্যর উত্তরধিকারী নির্বাচন করা হবে। হযরত দাউদ (আ.) হযরত জিব্রাইল (আ.) আদেশ অনুসারে নিজের পনের জন সন্তান ও বনি ইসরাইলদেরকে এক যায়গায় সমাবেত করে সিন্দুক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। এত আলেমের এর মধ্যে কেউ সদুত্তর দিতে সক্ষম হলো না। সর্বশেষে তাঁর ছোট ছেলে সোলায়মান (আ.) বললেন, হে পিতা! আপনি যদি আদেশ করেন তবে আমি এর রহস্য বলতে পারি। হযরত দাউদ (আ.) ছেলের বক্তব্য শুনে খুশি হলেন এবং তাকে উপস্থিত জনতার সম্মুখে সিন্দুকের ভিতরে খবর বলার জন্য আদেশ দিলেন। হযরত সোলায়মান (আ.) প্রথমে আল্লাহ তা’য়ালার নাম মুখে উচ্চারণ করলেন অতপর বললেন, ভাইসব সিন্দুকের মধ্যে আছে একটি হাতের আংটি, একটি চাবুক ও একটি চিঠি। এ কথা শুনে হযরত দাউদ (আ.) সকলের সম্মুখে সিন্দুকটি খুলে দেখলেন। হ্যাঁ ওর মধ্যে উক্ত তিনটি জিনিস রয়েছে। তখন তিনি সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা কে বলতে পার চিটির মধ্যে কি লেখা আছে। এক কথায় কেউ উত্তর দিতে পারল না। হযরত সোলায়মান (আ.) বললেন, আব্বা! আপনি যদি আদেশ দেন আমি বলতে পারব। হযরত দাউদ (আ.) বললেন,বল চিঠির বিষয়বস্ত কি? হযরত সোলায়মান (আ.) বললেন, চিঠির মধ্যে পাচটি বিষয়ে উল্লেখ করা রয়েছে। ঈমান, প্রেম, বুদ্ধি, শালীলতা ও শক্তি। হযরত দাউদ (আ.) তখন জিজ্ঞেস করলেন, মানুষের শরীরে এ পাঁচটি গুনের অবস্থান স্থানের নাম বল? হযরত সোলায়মান (আ.) তখন বললেন, ঈমান ও প্রেমের অবস্থান হচ্ছে মানুষের অন্তরে। বুদ্ধির অবস্থান হল মস্তিকে। শালীনতা ও লজ্জাবোধের অবস্থান হলো চোখ ও মুখে। শক্তির অবস্থান হল হাড্ডির মাঝে।
নবী-রাসূলগণ আল্লাহ তা’য়ালার কাছ থেকে যেসব কিতাব বা গ্রন্থ লাভ করেছেন সেসব ধর্মগ্রন্থকে আসমানি কিতাব বলা হয়।

আল্লাহ্তায়ালা অনেক নবীর উপর আসমানী কিতাব প্রেরণ করেছেন। যেন নবীরা আল্লাহ্ প্রদত্ত এলেম মানুষকে শিক্ষা দিতে পারেন। তার মধ্যে চারটি কিতাব প্রসিদ্ধ। যেমন হযরত দাউদ (আ.)এর উপর যাবুর, হযরত মূসা (আ.) এর উপর তাওরাত, হযরত ঈসা (আ.) এর উপর ইনজীল এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর উপর কোরআন শরীফ নাযিল হয়। এছাড়া আরো অনেক নবীর উপর ছোট ছোট কিতাব বা সহীফা নাযিল হয়। আমরা সকল আসমানী কিতাবের উপর দৃঢ় ঈমান রাখি। কুরআন হলো আল্লাহ্ তা’য়ালা প্রেরিত পূর্বের সমস্ত কিতাবের সমর্থক এবং বর্তমানে আল্লাহ্ তা’য়ালার একমাত্র মনোনীত আসমানী কিতাব। পূর্বের সমস্ত কিতাবের কার্যকারিতা আল্লাহ্ তা’য়ালা বন্ধ করে দিয়েছেন। কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের হেদায়েতের কিতাব হলো এই কোরআন। এই কিতাব সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেন, “এ সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা আল্লাহ্ তা’য়ালাকে ভয় করে এ কিতাব কেবল তাদের জন্যই পথ প্রদর্শক”। (সূরাঃ বাকারা,আয়াত-২)

ইসহাক ইব্ন বিশর.হাসান থেকে বর্ণনা করেন যে, দাউদ (আ) একশ বছর বয়সে হঠাৎ এক বুধবারে ইনতিকাল করেন। আবুস সাকান আল-হাজারী বলেছেন, হযরত ইবরাহীম খলীল, হযরত দাউদ ও তদীয় পুত্র হযরত সুলায়মান (আ.) তিন জনেরই মৃত্যু আকস্মিক ভাবে হয়েছিলো। এ বর্ণনাটি ইব্ন আসাকিরের। কারো কারো বর্ণনায় আছে যে, একদা হযরত দাউদ (আ) মিহরাব থেকে নীচে অবতরণ করছিলেন, এমন সময় মৃত্যুর ফিরিশতা তাঁর সম্মুখে এসে উপস্থিত হন। হযরত দাউদ (আঃ) তাকে বললেন, আমাকে নীচে নামতে বা উপরে উঠতে দিন! তখন ফিরিশতা বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনার জন্যে নির্ধারিত বছর, মাস, দিন ও রিযিক শেষ হয়ে গিয়েছে। এ কথা শুনেই দাউদ (আ.) সেখানেই একটি সিঁড়ির উপরে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন এবং সিজদারত অবস্থায়ই তাঁর রূহ কবয করা হয়।
হযরত ওয়াহাব ইবনে মুনীর (র.) এর বর্ণনায় দেখা যায়,হযরত দাউদ (আ.) এর লাশ গোসল,কাফন পড়িয়ে যখন লোকজন তাঁর জানাযা শেষে দাফন করার জন্য নিয়ে চললো,তখন প্রচন্ড রৌদ্রের তাপে লোকজন একেবারে অতিষ্ঠ ও শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলো। তা লক্ষ্য করে হযরত সোলায়মান (আ.) পক্ষীকুলকে আদেশ করলেন,তোমরা লাশবাহী লোক এবং জানাযা যাত্রীদের সাথে তাদের মাথার উপরে তোমাদের ডানার ছায়া দিয়ে চলতে থাকো। হযরত সোলায়মান (আ.) এর আদেশ অনুযায়ী লক্ষ লক্ষ পাখি মানুষের মাথার উপর পাখার ছায় দিয়ে চলতে লাগলো। বাতাসকে আদেশ করায় সে বইতে লাগলো সকলের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো। বর্ণিত আছে যে,হযরত দাউদ(আ.) এর জানাযায় অসংখ্য লোক শরীক হয়েছিলো,শুধু আলেম,হাফেজ ও ক্বারীই ছিলো প্রায় চল্লিশ হাজার।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট